#রম্যগল্প #বাচ্চাকাহিনী আমার ছোটবেলার বন্ধুরা খুব স্মার্ট ছিল। আমার মনে আছে আমরা এক কোচিং এ পড়তাম, সেখানে একজন স্যার ছিলেন এসেই বলতেন, “তোমরা আমার ছেলে মেয়ের মতো।” হঠাৎ, পেছন থেকে আমার এক ছোটবেলার বন্ধু সাব্বির বলতেছে, “স্যার তাহলে এই মাস থেকে আমি আর বেতন দিব না। ছেলে মেয়ের কাছ থেকে তো আপনি আর বেতন নিতে পারবেন না, তাই না?” সেই স্যার হাতের চকটি সোজা ছুড়ে মেরেছিলেন সাব্বির বরাবর আর আমরা সবাই একসাথে হেসে উঠেছি। আমাদের ছোটবেলার কথা মনে করতে করতে আমার মেয়ের কথা মনে এলো। একদিন সকালে ঠিক ৭ টায় ঘুম থেকে উঠে আমার ৭ বছরের মেয়ে খুব সিরিয়াস ভঙিতে ঘোষণা দিল— “আজ থেকে আমার নাম লেদী!” আমি তো একদম চমকে গেলাম। হাসব, না কাঁদব—কিছুই বুঝলাম না। কারণ তার নাম ফালাক্ক। ডাকনাম নাবিহা (নাবা)। অনেক শখ করে আকীক করে এই নাম রেখেছি। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “লেদী মানে কী?” সে একদম শান্তভাবে বললো— “লেদী (Ledig) মানে ফ্রি। আজ আমি কোনো কাজ করছি না, তাই আমার নাম আজ লেদী।” আমি ভাবলাম— শিশুর যুক্তি মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি! কোথায় ফালাক আর কোথায় লেদী! আরও মজার ব্যাপার— কয়েকদিন পর নতুন ঘোষণা— “আজ থেকে আমার নাম বেস্তেম্মা (bestemme)!” নরওয়েজিয়ান ভাষায় যার মানে—ডিসাইড করা আজ সে সব নিজেই ঠিক করবে তারপর থেকে প্রায়ই… একদিন অন্য নাম,আরেকদিন নতুন নাম। শেষ পর্যন্ত কোন নাম থাকে— আল্লাহ মালুম! আমার এক বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে গেছি। গিয়ে দেখি আমার বান্ধবী ওর ছেলে কে ভাত খাওয়াচ্ছে আর সে বাচ্চা ইউটিউব দেখছে। এই সময় ঘুম থেকে উঠে বান্ধবীর শাশুড়ি তার নাতি কে বলছে, “সারাদিন এইসব কি ইউটিউব দেখছ! ইউটিউব না দেখে খেতে চাও না? আমাদের সময় এগুলা ছিল না— আমরা কি না খেয়ে থাকতাম নাকি?” খাবারের প্লেট থেকে মুখ না তুলেই বাচ্চাটা বলছে, “এই জন্য তো তুমি বুড়ো হয়ে গেছ!” মোবাইলের ঘটনায় মনে পড়লো— আমার আরেক ভাগ্নি কে তার বাবা মানে আমার দুলাভাই বলছে, “এত মোবাইল দেখিস না, মাথা খারাপ হয়ে যাবে।” ভাগ্নি তার বাবা কে বলছে, “তুমি তো মোবাইল বেশি দেখ না, তোমার মাথা খারাপ হলো কিভাবে?” আমার মেয়ের ৫ বছর বয়সে আমরা নরওয়ে চলে আসি। সে বাংলার চেয়ে নরওয়েজিয়ান বলতে বেশি কম্ফোর্টেবল, যার ফল হিসাবে সে বাংলার অদ্ভুত অদ্ভুত ব্যবহার করে। মরুভূমিকে সে বলে “মরুঘুমি”, আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে বলে “বিদ্যুম চমকা।” প্রথম যেদিন সে নরওয়ে এসে বাইরে বেড়াতে এসেছে, বাইরে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করার পর ভয় পেয়ে বলতেছে— “মা! এই দেশের মানুষগুলো কোথায় মা??” আমি যে শহরে থাকি তার পপুলেশন মাত্র ২.৮ লাখ। সো মানুষজন খুবই কম। কিন্তু এরপর দেশে বেড়াতে গিয়ে সে বলতেছে— “এখানে কি হয়েছে! সবাই কেন আমাদের বাসার সামনে?” সে বুঝতেই পারেনি— নরমালই ঢাকায় একটা রাস্তার সামনে হাজার হাজার মানুষ থাকে। আমার মেয়ের বান্ধবী আন্না ঘোষণা করেছে এই ভার্শানের পৃথিবীটা তার বেশি ভালো লাগছে না, বোরিং লাগছে। তাই সে আরেকটু আপডেটেড ভার্শানের পৃথিবী চায়। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম কি ধরনের আপডেট সে চায়, সে বলতেছে সে চায় তার পেট (বিড়াল) তাকে কোলে নিয়ে ঘুরে বেড়াক, যেমনটা এখন সে তার বিড়াল কে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। যেহেতু সে বেশ ছোট বয়সে দেশের বাইরে চলে এসেছে, তাই বাংলাদেশের অনেক কিছুই সে ভুলে গেছে। তার মধ্যে একটা হলো রিকশা। এইবার দেশে গিয়ে সে মেশিন রিকশায় উঠেই কান্না শুরু করেছে— যেহেতু মেশিন রিকশা দমকা হাওয়ার বেগে চলে— “মা, এই গাড়িতে সিটবেল্ট নাই! মা হেলমেট নাই!” আমার ভাতিজি, ২ বছর বয়স, আমাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে সারাক্ষণ বাইরে বাইরে ঘুরতে চায়। আমি তাকে অনেক কষ্টে বাসার ভেতরে ঢুকাতে রাজি করালাম, আমার সুন্দর নতুন বানানো দোতলা বাড়ি। সে আমাকে বলতেছে— “ফুপ্পি, এইটা আমার বাড়ি” আর পেছন দিকে ভাঙা একটা শনের ঘর দেখায় বলে— “ঐটা তোমার বাড়ি।” আশেপাশের সবাই ওর এই কাণ্ড দেখে হেসেই কুটিকুটি। তাকে রাতে জিজ্ঞেস করলাম, “রাতে দাঁত ব্রাশ করেছ?” সে বলে— “কালকেই না মাজলাম! আমার দাঁত রোজ ময়লা হয় না।” আমার বোনের ৪ বছর বয়সী মেয়ে তার ৭ মাস বয়সী ভাইকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতেছে। ওর মা বলতেছে— “ডাকতেছ কেন? দেখছো না ঘুমাচ্ছে, চুপ করে বসে থাক।” আমার ভাগ্নি তার মাকে বলতেছে— “বাবু (মানে তার ভাই) উঠে গেলেই আমি চুপ করে বসে থাকব।” এই বাচ্চাটি বেশ শার্প, এখন বয়স ৭। সে লেফট হ্যান্ড। সো সে যখন খেতে বসে তার মা সবসময় খেয়াল করে সে ডান হাতে খাচ্ছে কিনা। তো একদিন তাকে ডাইনিং এ খাবার দিয়েছে আর ওর মা কিচেনে কিছু একটা করছিল। জিজ্ঞেস করল— “কোনটা দিয়ে খাচ্ছো?” সে উত্তর দিল— “মুখ দিয়ে মা।” তার মা যখন তাকে বলল— “তোমার মাথায় এত বুদ্ধি আসে কোথা থেকে?” সে বলতেছে— “মা, ডাউনলোড হয়ে আসে!” সে আমার সাথে বাইরে যাবে বলে রেডি হচ্ছে। আমি দেখলাম জামা পড়েছে উল্টো। আমি বললাম— “কি ব্যাপার টুকটুকি! ড্রেস কেন উল্টো পড়েছ?” সে বলতেছে— “না খালামনি, আমি উল্টো পড়িনি, ড্রেসটাই এমন ছিল। আমি শুধু ওর ইচ্ছা মত ঢুকে গেছি আর জোর জবরদস্তি করিনি।” আমি বললাম— “সে তো বুঝলাম, কিন্তু জামার হাতগুলো ভিজল কি করে?” সে বলতেছে— “আমার দোষ নাই তো, মা বলল হাত-মুখ ধুয়ে যেতে। হাতগুলো জামার ভেতরেই তো ছিল।” আমি পুরাই হতবাক তার বুদ্ধি দেখে। আমার মেয়ে Yellow বলতে পারতো না, বলতো Lelo। সো সে যখন Yellow এর বানান শিখলো, কোনভাবে তার মনে হয়েছে যা কিছু Y দিয়ে শুরু—তার উচ্চারণ হবে এল বা ল এর মতই। তার বাবা তাকে নিয়ে একটা Yo-Yo কিনে এনেছে, বক্সে নামের বানান লেখা YO-YO. দেখি সে এটাকে বলতেছে— “লো-লো।” তারপর সে যখন Orange বানান শিখলো (কালারের), টিচার যখন তাকে ফল হিসাবে Orange এর বানান শিখালো, সে খুবই অবাক— আমাকে বাসায় এসে বলতেছে— “মা জানো Orange যে ফ্রুটটা, সেটার স্পেলিংও একদম কালার Orange এর বানানের মতো!” আমার ভীষণ দুষ্টু কাজিন ফাইয়াজ কে তার দুষ্টুমিতে অতিষ্ঠ হয়ে টিচার জিজ্ঞেস করলো— “তুমি কেন স্কুলে আসো?” সে নির্দোষ মুখে উত্তর দিল— “মিস, দুষ্টুমি করতে বাসার সবাই এখন খুব চালাক— আর বেশি সুবিধা করতে পারিনা। তাছাড়া রোজ সকালে মা ও বলে— ‘যা, আমার মাথা খেয়ে এসেছ, এখন মিসদের টাও একটু খেয়ে আয়।’ তাই চলে আসি। আম্মুই দিয়ে যায়।




http://dlvr.it/TP0MYM

Comments

Popular posts from this blog

ধারাবাহিক উপন্যাস নিয়তি/ পর্ব ১৬ (সমাপ্তি)