#ধারাবাহিক_উপন্যাস_নিয়তি #পঞ্চদশ পর্ব: সাদাব বারবার দেখতে লাগলেন সেই সিসিটিভি ফুটেজ…ভাবলো আচ্ছা, হাসানের মতো বোকা বোকা দেখতে একটা ছেলের প্রেমে এই সব মেয়েরা কেন পড়ে? তার ২৯ বছরের জীবনে তো কখনো প্রেম এলো না। সে দেখতে বরাবরই ভালো। লেখাপড়া, ক্যারিয়ার সব মিলিয়ে এই হাসানের চেয়ে তার ডিমান্ড মেয়ে মহলে কম হবার তো কথা নয়, তবু তাকে কোনো মেয়ে প্রেমিক হিসেবে আমলেই নিল না কেন? ভাবতেই ভীষণ হাসি পেল সাদাবের। সাদাব ভাবছিলেন হাসানের অন্তর্ধানের পর যখন পুলিশ তাদের বাসায় যায়, তখন কোনো আলামত কেন পায়নি। খুব গুছিয়ে চিন্তা করতে লাগলেন। হাসানের অন্তর্ধানের পরে পুলিশ এলো আর আলমারির দরজা খুলে দেখল। দরজা জোর করে ভাঙা হয়নি; সে অর্ধখোলা অবস্থাতেই ছিল। কোনো স্ক্রু-ড্রাইভারের ছাপ নেই, কোনো শক্ত-প্রবেশের চিহ্নও নেই। কিন্তু মেঝেতে আর্দ্র কফি-গুঁড়া ছড়ানো, ন্যাপথলিনের আঠালো চিহ্ন, আর টেপের চৌকস ছেঁড়া অংশগুলো মিলল। কাঠের ভেতরে ছোট ছোট পলিথিন কণা পাওয়া গেল—ফ্রিজার ব্যাগের অবশিষ্টাংশ। আর আলমারির নীচে পাতলা একটা ঢেউ-ছাপ—যেন ভ্যানের টায়ারের নিচে থেকে কোনো ভারী জিনিস ইনডেন্ট করেছে। সাদাব রিপোর্ট দেখে বললেন, “এখানে জোর করে ব্রেক ইন হয়নি—কেউ জানলা/দরজা অজান্তে খোলা রেখেছিল। যদি কেউ এসেও থাকে, সে বা তারা এসেছে, অনুমিতভাবে দরজা অর্ধখোলা পেয়েছে, ভেতরে ঢুকেই কাজ সেরে গেছে। তাই বাকি প্রমাণগুলো (টেপ-ছেঁড়া, পলিথিন কণা, কফি কণা) আরও স্পষ্টভাবে দেখা যাবে—কারণ প্রোফেশনালরা জোর করে লক ভাঙার ঝামেলা করেনি।” ফরেনসিক নোটে পরে যুক্ত হলো: অপ্রাকৃতভাবে অর্ধখোলা দরজা মানে • শত্রু-চিহ্ন অনুপস্থিত; ফলে অপারেটররা সরাসরি আলমারিতে ঢুকেছে। • ফলে তাদের গ্লাভস-অদলবদল, ব্যাগ-আচরণ ও টিপিক্যাল ট্রান্সপোর্ট-মার্কস (ফ্রিজার ব্যাগ রেসিডিউ) এখানেই থেকে গেছে। সাদাব হালকা করে বললেন, “হাসান দরজা লক করে গেলে, স্ক্রু-চিহ্ন থাকত—এখন দেখো, কেউ ঢুকেছে বেসরকারিভাবে; তারা সহজেই আলমারি থেকে প্যাকেট তুলে নিয়ে গিয়েছে। এই সামান্য তফাতটা পরবর্তী তদন্তে বড় কৌতুক তৈরি করবে—‘জোর করে ঢুকেছে’ বনাম ‘খোলা রাখা ছিল’—এটাই ওদের কাহিনী বদলে দেবে।” ঢাকার উত্তরা, রাত ১টা ২০। রিনি বাবার ফোন শেষ করে স্তব্ধ। “ডিবির কেসের খবর ও জানে কীভাবে?” মাথা ঘুরতে থাকে রিনির। ছোটবেলা থেকেই মা না থাকায় নিজের মধ্যে খুব কনফিডেন্সের অভাব তার। সে ভীষণ মেধাবী ছিল। বাবার আগ্রহে অনলাইনে ডাটা এনক্রিপশন, অ্যানালাইসিস সহ বেশ কিছু কোর্স করেছে। ইদানীং টুকটাক ফ্রিল্যান্সিংও শুরু করেছিল সে। এর মধ্যে হাসানের সাথে বিয়ে তার দুনিয়া বদলে দিল। বাবার কথায় তার কেমন যেন মন খারাপ হলো। ফোন তুলল সাদাবকে, এক রিং-এ ধরলেন সাদাব, মনে হলো যেন তার ফোনের অপেক্ষায়ই ছিলেন। “হ্যালো সাদাব স্যার।” “রিনি, এত রাতে তুমি?” “সরি আপনি মনে হয় ঘুমাচ্ছিলেন-” “আরে না, আমি এখনো অফিসে, বলো।” “আচ্ছা হাসান ভাই আর পুলক সেনের কেস নাকি প্রায় ক্লোজ হয়ে এসেছে।” “কে বলল তোমায়? কই না তো, আমি এখনো কাজ করছি।” “না, মানে বাবা বলছিলেন…” অন্যমনস্ক শোনাচ্ছিল রিনির গলা। কৌতুহলী সাদাব জিজ্ঞেস করলেন – “কী বলল তোমার বাবা?” রিনি ফোন কানে ধরে এক মুহূর্ত চুপ করে ছিল। ঘরের টিউবলাইটে খাটের পাশে রাখা বাবা-মা সহ তার ছোটবেলার ছবির পুরনো ফ্রেম—হাসিমুখ, তার কাঁধে হাত, কী নিশ্চিন্ত নির্ভরতার। সেই মুখটাই আজ অচেনা লাগে। “স্যার,” রিনি আস্তে বলল, “বাবা বলল—ডিবির কেস খুব তাড়াতাড়ি পুলিশের কাছে যাবে। পুলক ‘উগ্রবাদীদের’ হাতে… আর হাসান ‘স্বেচ্ছায় নিখোঁজ’।” রিনি অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। কী মনে করে অনেকদিন পর তার জিমেইল খুলল, সেখান থেকে মাইক্রো ওয়ার্কারের ওয়েবসাইট যেখানে সে কাজ করত। কিছুক্ষণ পর কম্পিউটার খোলা রেখেই ঘুমিয়ে পড়ল রিনি। হঠাৎই পপ আপ করল ছোট্ট একটা নোটিফিকেশন। না ঘুমালে হয়তো জানতে পারত তার ল্যাপটপটা-ও ট্র্যাক করা হচ্ছে, আর সেটা একটা আননোন লোকেশন থেকে। পরদিন সকালে পত্রিকার প্রথম পাতার হেডলাইন “ধর্মীয় উগ্রবাদীদের হাতেই খুন হয়েছেন পুলক সেন”। সকালে ১০ টায় নিজের ফ্ল্যাটে বসে পত্রিকা পড়তে পড়তে ভ্রু কোঁচকালেন সাদাব। সে এখনো রিপোর্ট জমা দেননি। এর মাঝে কী করে এমন খবর বের হলো। পুরো সংবাদটি পড়লেন। স্পেসিফিকভাবে কারো নাম উল্লেখ না করে, পুলিশের বরাতে জানানো হয়েছে। হেডকোয়ার্টারে ফোন করে আইজি-র অ্যাপয়েন্টমেন্ট চাইলেন, এর মাঝে কল এলো জয়েন্ট কমিশনার (ডিবি), ডিএমপি-র। “সাদাব, পুলক সেনের কেসটা, ডিবি থেকে পুলিশের কাছে চলে গেছে। তুমি আপাতত অন্য কেইসগুলো নিয়ে আগাও।” ‘কেন’ জিজ্ঞেস করার আগেই তিনি বললেন, “আর শোনো, ঐ যে হাসান নামে ঢাকা ইউনিভার্সিটির একটা ছেলের নিখোঁজের একটা কেইসও ছিল বোধহয় তোমার হাতে, এটা নিয়ে আপাতত মাথা ঘামানোর কিছু নাই। ছেলেটির পরিবার থেকে জানানো হয়েছে, ছেলেটি নাকি বাসা থেকে রাগ করে চলে গিয়েছিল, দেশের বাইরে চলে গেছে। ওর পরিবার নিশ্চিত করে কেইস তুলে নিয়েছে। তুমি আপাতত ফ্রি সাদাব। গুড জব। টেইক সাম রেস্ট।” আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কল কেটে দিলেন জয়েন্ট কমিশনার। সাদাব কাল রাতে রিনির ফোনের কথা ভাবলেন। রিনি প্রায় একই কথা বলছিল—তার মানে সব গোড়া এক জায়গাতেই। সাদাব নিশ্চিত হলেন, তালিব রহমান তার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা ব্যবহার করে পুরো তদন্তকে ধামাচাপা দিয়েছেন। কিন্তু তার মাথার ভেতর তখনো ঘুরছে T.R.-এর এনক্রিপ্টেড নোট এবং হাসানের রেখে যাওয়া ‘প্যাটার্ন’ খোঁজার বার্তা। তিনি জানেন, তার প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা শেষ। এই মুহূর্তে তার একটাই পথ খোলা—ছায়া থেকে কাজ করা।




http://dlvr.it/TP2tVB

Comments

Popular posts from this blog

ধারাবাহিক উপন্যাস নিয়তি/ পর্ব ১৬ (সমাপ্তি)